LATEST$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0

$type=grid$count=4$tbg=rainbow$meta=0$snip=0$rm=0$show=home

নিভৃত সংলাপ: মুখোশ, বিবেক ও অস্তিত্বের পঞ্চাশটি কবিতা | প্রসূন গোস্বামী

প্রসূন গোস্বামী Prasun Goswami
✧ কবিতার বই ✧
“মুখোশের আড়ালে বিবেকের সিঁড়ি বেয়ে নিভৃত সংলাপ – পঞ্চাশটি কবিতায় জীবন, জলের হাহাকার ও পাথরের গল্প।”
বাংলা কবিতা আধুনিক কবিতা মুখোশ ও মুখ বিবেক নীরবতা প্রসূন গোস্বামী নিভৃত সংলাপ
◈ ১ ◈
এ এক অন্য স্নান
মুখের ওপর অনেকগুলো মুখ
জমতে জমতে পাহাড় হয়ে যায়,
আমরা ভাবি ওটাই বুঝি সত্য—
আড়ালে হাত রক্ত ধুয়ে নেয়।

বুকের ভেতর শব্দহীন এক নদী
এখনও কি আগের মতোই স্থির?
দম্ভ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শহর
পায়ের তলায় কাঁপছে মাটির তীর।

পাপ তো নয়, এ এক আপস মাত্র
প্রতিদিনের চেনা অভ্যাসে,
আয়নাটাকে সরিয়ে রাখি দূরে
বিবেক এখন পাশের ঘরে হাসে।

নিঃশব্দে আজ নিজের মুখোমুখি
দাঁড়াও একবার শঙ্খ-সাদা ভোরে,
নিজের কাছেই নিজের নত হওয়া
মুক্তি আসুক এই নিভৃত জ্বরে।
◈ ২ ◈
মুখোশ ও মুখ
এখন কথা বলা মানেই
হাতে হাত রাখা নয়,
বরং আঙুলের ফাঁকে
লুকিয়ে রাখা একচিলতে বিষ।

তুমি বলছ আকাশ—
আমি দেখছি বিঁধে থাকা কাঁটাতার,
শহরের জঠরে বড় হচ্ছে
যতসব পালিত অন্ধকার।

এতটা চিৎকার করো না
শব্দরা বড় লজ্জিত আজ,
তার চেয়ে বরং এসো—
নিঃশব্দে খুলে রাখি সব অহঙ্কার।

হাঁটুর ওপর রাখা দুই হাত
এখনো কি কাঁপছে ভয়ে?
নাকি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
নিজেকেই চেনা যাচ্ছে না আর?
◈ ৩ ◈
মুখোশের আড়াল
বললেই কি আর ফেরা যায় সহজতায়?
এখন তো চারিদিকে কেবল কারুকার্য—
আঙুলের ডগায় লেগে থাকে চতুর প্রলেপ
আমরা কি তবে আয়নার সামনেও আজ অপাঙ্ক্তেয়?

বুকের ভেতর যেটুকু ভাঙচুর ছিল
তাকেও সাজিয়ে রেখেছি ড্রয়িংরুমে,
সস্তায় বিকিয়ে দিচ্ছি আমাদের ব্যক্তিগত মৌন।

অথচ কথা ছিল,
দাঁড়াব শিরদাঁড়া সোজা করে—
একটি অন্তত ধ্রুবপদ ছুঁয়ে বলবে কেউ:
"তোমার ওই চোখের কোণে এক চিমটি সত্য লেগে আছে।"

আমরা কি তবে সেই সত্যটুকুর জন্যেও
এখন অন্যের অনুমতির অপেক্ষায় থাকব?
◈ ৪ ◈
নীরবতার আড়াল
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে
তুমি কি তবে একলা একা?
বুকের ভেতর পাথর জমা—
সেখানেই কি নিভৃত দেখা?

সবাই যখন উচ্চরোলে
বিকিয়ে দিচ্ছে নিজের ভাষা,
আমি তখন কুড়িয়ে নিই
চুপ করে থাকা এক চিলতে আশা।

আঙুল ছোঁয় না আঙুল আর
মাঝখানে আজ অনেক দেওয়াল,
তবুও হারায়নি সবটা পথ
রক্তে জাগুক শুদ্ধ খেয়াল।
◈ ৫ ◈
জল ও পাথর
মুখের ওপর হাত রাখা খুব সহজ
কিন্তু হাতের ওপর মুখ রাখা কি যায়?

আমরা যারা ধুলোর ভেতর হাঁটি
আমরা যারা শব্দ খুঁজি একা
আমাদের এই ভাঙা ঘরের কোণে
আয়না জুড়ে কেবলই কুয়াশা।

বলো দেখি, কতটা পথ গেলে
নিজের ছায়া নিজে চেনা যায়?
দাঁড়িয়ে আছি স্তব্ধ পাহাড় হয়ে—
ভিতরে তার জল নেমেছে ঠিকই,
বাইরে কেবল কঠিন পাথর জমা।

তুমি কি সেই জলের হাহাকার
শুনতে পাও খুব নিভৃত কোনো রাতে?
নাকি তুমিও পাথর হতে হতে
শিখে গেছ আয়ু মাপার খেলা?
◈ ৬ ◈
জলছাপ
দাঁড়াও কিছুক্ষণ।
আয়নার ভেতরে আজ কি কোনো
মুখ আছে মানুষের?

নাকি কেবলই কিছু
সাজানো বিজ্ঞাপন,
কিছুটা চাতুর্য আর
অন্ধকারের প্রলেপ।

বুকের বাঁদিকে আজ
পাথর সরিয়ে দেখো,
এক ফোঁটা জলছাপ—
এখনও কি কাঁপে?

নত হও নিজের কাছে,
যদি বাঁচতে চাও।
◈ ৭ ◈
জলরেখা
কথার ওপরে কথা বসলেই
সেটা আর সত্যি থাকে না।

আমরা তো কেবল নিভতে চেয়েছিলাম
আড়ালে, নিজেরই ছায়ায়—
অথচ দ্যাখো, শহর জুড়ে আজ
উন্মত্ত উৎসবের আলো।

মাথা নিচু করে থাকা মানেই
পরাজয় নয় সবসময়,
কিছুটা বিনয় জমা থাক
আগামীর ওই রক্তক্ষরণে।

তুমি হাত পাতলে আমি
শূন্যতা দেবো,
সেটুকুই যা আমার নিজস্ব।
◈ ৮ ◈
ছায়া
হাত পাতলেই কি আর পাওয়া যায় জল?
কিছু তৃষ্ণা বুকের ভেতরেই পুষে রাখতে হয়।

যেমন এই উঠোন, রোদে পুড়ে যাওয়া একা—
দেয়ালের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমরা কেউ কাউকে চিনি না অথচ
পাশাপাশি হেঁটে যাই দীর্ঘকাল।

মুখোশের নিচে আরও একটা মুখ থাকে,
শব্দের আড়ালে জমে থাকে কতগুলো পাথর।
তুমি যাকে মুক্তি ভাবছ, আসলে তা নয়—
পায়ের কাছে নিজেরই ছায়া আজ খুব ভারী।

এতটুকু কথা বলতেও এখন ভয় লাগে,
যদি বাতাসের গায়ে আঁচড় লেগে যায়।
◈ ৯ ◈
নিস্তব্ধতা
দাঁড়াও, একটু সরে দাঁড়াও।
আলোর নিচে ছায়াটা বড্ড স্পষ্ট।

তুমি তো চেয়েছিলে ঘর,
অথচ চারদিকে দেয়াল তুলে দিলে।
এখন বাতাসের শব্দেও মনে হয়—
কেউ যেন বিচার চাইছে।

সবাই কথা বলছে সমস্বরে,
অথচ কারো মুখে কোনো ভাষা নেই।
আমি শুধু নিজের আঙুল গুনি;
রক্ত কি শুকিয়ে গেল? নাকি মিশে গেল?

এতটা নিচু হয়ে মাথা নোয়ালে
আকাশ কি আর দেখা যায়?
◈ ১০ ◈
মুখ
আয়নার সামনে দাঁড়ালে আজ
চেনা মুখটা কেমন যেন অচেনা লাগে।

আমরা তো চেয়েছিলাম একমুঠো আকাশ,
অথচ মুঠো খুলতেই দেখি—
কেবল বালু আর কিছু ভাঙা কাচ।

শহরের ধুলোয় মিশে গেছে সব নালিশ,
কেউ কারো চোখের দিকে তাকাই না।
সবাই খুব সাবধানে পা ফেলি,
যেন একটা মৃতদেহ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা।

তুমি কি ভাবছ, এই চুপ থাকাটাই মুক্তি?
পাথরের গায় কি কখনও ঘাম জমে?
◈ ১১ ◈
পরিধি
সীমানা বাড়ছে ক্রমশ,
অথচ আমরা সবাই ছোট হয়ে যাচ্ছি।

দেয়ালের গায়ে কান পাতলে শোনা যায়—
আমাদেরই ফেলে আসা কথাগুলো।
তুমি তো শিখিয়েছিলে সোজা হয়ে হাঁটা,
এখন দেখি, ঝুঁকে পড়াই হলো নিয়ম।

আলোর চেয়ে অন্ধকারই এখন বেশি দামী,
কারণ সেখানে অন্তত মিথ্যেগুলো ঢাকা থাকে।

বইয়ের পাতায় যে আগুন ছিল,
তাকে নিভিয়ে দিয়েছ কি সাবধানে?
এখন শুধু ধোঁয়াটুকু আমাদের পরিচয়।
◈ ১২ ◈
জলরেখা
দাঁড়াতে চেয়েছিলাম সহজ কোনো
মাটির ওপর ঠিকই,
অথচ এই করতল জুড়ে আজ
মিথ্যে কেবল লিখি।

অনেক কথা জমিয়ে রাখা ছিল
বলব না আর ভেবে,
পাথর চাপা সেই যে নীরবতা
কে আর তাকে নেবে?

নিজের সঙ্গে নিজের এই আড়াল
আয়না জানে সব,
বুকের কোণে বাড়ছে ধিক্কার
অস্ফুট কলরব।

ছায়ায় মিশে যাচ্ছি প্রতিদিন
পায়ের চিহ্নহীন,
হয়তো এটাই প্রাপ্য ছিল আমার—
শব্দবিহীন ঋণ।
◈ ১৩ ◈
পাথরের লিপিকা
এখন কথা বলার চেয়েও বড়ো
চুপ করে থাকা,
বুকের ভেতর অনেকগুলো দেওয়াল
অন্ধকারে আঁকা।

ডান দিকে সেই মিথ্যে সাজানো পথ
বাঁ দিকে সংশয়,
নিজের ছায়ায় নিজেই ঢাকা পড়ে
বাড়ে অসময়।

হাত বাড়ালেই স্পর্শ পাওয়া যায় না
কেবলই দূরত্ব—
সবাই যখন সশব্দে পার হয়
আমিই নিভৃত।

আয়নাটাকে সরিয়ে রেখে আজ
দাঁড়াই মুখোমুখি,
দেখি কেমন শব্দহীন এক পাথরে
নিজেকে লিখি।
◈ ১৪ ◈
বিবেকের সিঁড়ি
শব্দ এখন সাজিয়ে রাখা পণ্য
দোকান জুড়ে ভিড়,
আমরা সবাই হাত নেড়ে আজ
বিকিয়ে দিচ্ছি নীড়।

যাদের হাতে মশাল থাকার কথা
তারাও আজ অন্ধ,
ঘরের কোণে জমাট বাঁধা ধুলো
আর দুর্ভেদ্য বন্ধ।

পায়ের নিচে আলগা হয়ে আসে
পুরনো সেই মাটি,
আমরা কি তবে কেবলই শিখছি
মিথ্যে পরিপাটি?

আড়ালে রাখা নিজের ওই হাত
রক্তে মাখামাখি,
তবুও আমরা আয়নার সামনে
আরেকজনকে রাখি।
◈ ১৫ ◈
নিভৃত সংলাপ
সবাই যখন বৃক্ষ সাজায়
আমি খুঁজি মাটি,
উচ্চাশার এই বুনন ছিঁড়ে
স্বপ্নগুলোই খাটি।

শহর জুড়ে বিজ্ঞাপনে
মুখ লুকোনো দায়,
রক্তাত এই হাতের রেখা
ধুচ্ছে কোন ধারায়?

পাথরচাপা ঘাসের নিচে
একটি শুধু প্রাণ,
দম্ভ নিয়ে ফিরছে মানুষ
করছে জয়গান।

ভিতর-বাইরে অনেক ব্যবধান
পেরিয়ে যেতে যেতে,
দেখছি আকাশ মিলিয়ে গেল
ধুলোর শতরঞ্চিতে।
◈ ১৬ ◈
অপেক্ষা
রাস্তার ধারে একা দাঁড়িয়ে আছে এক পাথর
তার গায়ে লেগে আছে কত না-বলা কথা।
তুমি ভাবছো ওটা কেবলই জড়,
অথচ ওর ভেতরেই জমা হচ্ছে আমাদের যাবতীয় নীরবতা।

হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় না তাকে,
সে তো নিজের ভেতরেই নিজে লুকানো।
অন্যায়ের সামনে আজ আমরা সবাই পাথর,
শুধু বুকের ভেতরটুকু এখনও ভিজে থাকা পুরানো।

দাঁড়াও, একটু সময় দাও ওই মৌনতাকে—
দেখবে, একদিন ওটাই ভাষা হয়ে ফিরে আসবে।
◈ ১৭ ◈
পিতার স্বগতোক্তি
এই ক্ষয়ে যাওয়া প্রাসাদে এখন কেবলই নোনা ধরেছে,
পলেস্তারা খসে পড়ছে এক একটা মিথ্যে আশ্বাসের মতো।
আমি চেয়েছিলাম এক মুঠো রোদ্দুর তোমার জানলায়—
অথচ দেখো, চারিদিকে আজ কেবলই অন্ধকারের ক্ষত।

আমার হাতে ছিল শুধু একটা পুরনো মানচিত্র,
যেখানে নদীগুলো সব শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে বহু আগে।
তুমি যখন রক্তের দাগ মুছে নিতে চাও নতুন বসনে—
আমার তখন মনে হয়, এই অপরাধের ভাগী আমিই সবচেয়ে আগে।

হাঁটু গেড়ে বসেছি আজ নির্জন এক প্রাঙ্গণে,
মাথা নত করে বলছি— দোষ আমারই, শুধু আমার।
আগামীর হাতগুলো যেন কলুষমুক্ত থাকে অন্তত,
নইলে এই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়বে আমাদেরও অহংকার।
◈ ১৮ ◈
বিজ্ঞাপন
এখন শব্দের চেয়ে রঙের চটক বেশি,
মুখোশের আড়ালে হাসছে বিকৃত হাসি।
সবাই চাইছে নিজেকে বিকিয়ে দিতে—
কারো হাতে রক্ত, কেউ ব্যস্ত হাত ধুতে।

দাঁড়াও, এই ভিড়ে মিশো না এখনই তুমি,
পাথরের তলায় মরছে যে চেনা ভূমি—
সেখানে ঘাস নেই, শুধু আছে দম্ভের গান,
পুরো শহরটাই এখন এক মস্ত দোকান।

কে কার বিচার করে? সবাই তো বিক্রেতা,
আমরা কেবলই হচ্ছি নিভৃত নীরব শ্রোতা।
◈ ১৯ ◈
ছদ্মবেশ
সবাই এখন মুখোশ পরে ঘোরে,
আসল মুখটা হারিয়ে গেছে ভিড়ে।
বিজ্ঞাপনে সাজানো হাসির নিচে—
বিবেক শুধু একলা ঘরে ফেরে।

তুমি ভাবছ তুমিই আছ একা,
আয়না জুড়ে হাজার লোকের ছায়া।
আমরা এখন শব্দ খুঁজি মিছে,
হারিয়ে গেছে বুকের পুরানো মায়া।

দাঁড়াও কিছুক্ষণ, নিজের মুখোমুখি—
দেখবে তোমার সত্তা কেমন দুঃখী।
◈ ২০ ◈
শিলালিপি
মাথার উপরে ভেঙে পড়ে আছে মস্ত বড় আকাশ,
পায়ের নিচে কেবলই ধুলো আর শুকনো ঘাস।
তুমি বলেছিলে সম্রাট হবে, জয় করবে এই মরুভূমি,
অথচ নিজেরই ছায়ার কাছে আজ হার মেনেছ তুমি।

তোমার হাতে ছিল না তলোয়ার, ছিল কেবল কলম,
ভেবেছিলে ওই কালিতেই হবে সব ক্ষতের মলম।
এখন সেই খাতা ছিঁড়ে ফেলে রাজপথে ওড়ে হাওয়া,
পাওয়া না-পাওয়ার হিসেবে এখন শুধু শূন্যে ফিরে যাওয়া।

দাঁড়াও পথিক, এই পাথরের গায়ে হাত দিয়ে দেখো একবার—
এখানেই লেখা আছে আমাদের সমস্ত মিথ্যে অহংকার।
যে নদীটা শুকিয়ে গেছে তার গল্প কেউ কি রাখে?
আমরা কেবল স্মৃতি খুঁড়ে খুঁড়ে বন্দি করি তাকে।
◈ ২১ ◈
দূরত্ব
হঠাৎ দেখি তোমার চোখে বৃষ্টি হয়ে নামছে জল,
অথচ আমি অনেক দূরে, শুকনো মাটির এই সম্বল।

পাশেই ছিলে, আঙুল দিয়ে ছুঁতে গেলেই জলছবি—
আমরা কেবল ছায়ার পিছে দৌড়ে যাওয়া এক কবি।

শব্দ ছিল হাজার হাজার, আজকে দেখি সব নীরব,
হারিয়ে যাওয়া দিনের মতো আমরা এখন এক অনুভব।

একটু সরো, ছায়াটা তার নিজের শরীর খুঁজে পাক—
স্মৃতির ভেতর একলা নদী অনেক দূরে বয়েই যাক।
◈ ২২ ◈
উত্তরাধিকার
খোকা জিগ্যেস করে, "বাবা, আজ সব আলো নিভে গেল কেন?"
আমি বলি, "ভয় নেই, ওটা আসলে অন্ধকারের একরকম ছদ্মবেশ।"
সে আবার শুধোয়, "তবে আমরা কি এখন পথ হারাব?"
আমি তার ছোট হাতখানা ধরে বলি, "না, পথ তো আমাদের বুকের ভেতরেই ছিল।"

শহরজুড়ে যখন মিথ্যের উৎসব চলে,
তখন চুপ করে থাকাটাও একরকমের কথা বলা।
তুমি শিখো না ওদের মতো করে চিৎকার করতে,
বরং নিজের মেরুদণ্ডটাকে সোজা রেখে ঘাসের মতো নুইয়ে থাকতে শেখো।

ঝড় থামলে দেখবে—
যারা মাথা নোয়ায়নি, কেবল তারাই আবার সবুজ হয়ে জেগেছে۔
◈ ২৩ ◈
চাবি
হাতের তালুতে এখন এক টুকরো ঠান্ডা লোহা,
আমি তাকে চিনি, সেও চেনে আমার আঙুলের রেখা।
অথচ যে কপাট খোলার কথা ছিল আজ দুপুরে—
তার হদিস মেলেনি কোনো মানচিত্রের ভিড়ে।

আমরা কেবল পকেটে নিয়ে ঘুরি এক একটা চাবি,
আর মনে মনে সাজাই মস্ত বড় এক একটা দাবি।
অথচ ঘরের ভেতর ঘর, তার ভেতরেও গাঢ় অন্ধকার—
সেখানে পৌঁছনোর সাধ্য আছে কি কোনোদিনও তোমার?

দাঁড়াও, এই জং ধরা লোহাটার দিকে তাকিয়ে দেখো—
সে হাসছে, কারণ তুমি তালাটাই চিনলে না কোনোদিন।
◈ ২৫ ◈
ছোটদের বড় হওয়া
বিকেলের ওই রোদের পিঠে
চড়েছিল এক খোকন সোনা,
তার ঝোলাতে উপচে পড়ে
হাজার রঙের স্বপ্ন বোনা।

হঠাৎ এল মস্ত মানুষ,
কালো কোট আর চশমা চোখে,
বললে— "থামো! এসব ছবি
দেখাতে নেই অন্য লোকে।"

স্বপ্নগুলো পকেট ভরো,
শিখতে হবে হিসেব কষা,
রাজপ্রাসাদে আসন পেতে
উল্টো দিকেই মুখটি বসা।

খোকন এখন মস্ত বড়,
ভুলেছে তার নীল পাহাড়টা—
হাতের মুঠোয় শক্ত মুঠোয়
লুকিয়ে রাখে হাহাকারটা।
◈ ২৬ ◈
সংশয়
তুমি বললে, সোজা পথে হাঁটো।
আমি ভাবলাম—
পথ কি আদৌ সোজা? নাকি ওই বাঁকটার মুখে
আমারই ছায়া আমাকে ভয় দেখাচ্ছে?

হাত পেতেছিলে যখন,
ভেবেছিলাম ভালোবাসা।
এখন দেখি, ওটা আসলে একজোড়া হাতকড়া—
অদৃশ্য, অথচ বিঁধছে মজ্জায়।

আমি কি তবে মিথ্যে বললাম?
নাকি সত্যিটাই খুব বেশি রঙিন হয়ে গেল?

থামো।
আগে আয়নার ধুলোটা মুছে নিই,
তারপর নাহয় নতুন কোনো যুদ্ধের গল্প শোনো।
◈ ২৭ ◈
অনুমতি
বসো বললে বসব আমি
হাঁটো বললে হাঁটব,
নিজের জিভটা আলগা পেলে
কাঁচি দিয়েই কাটব।

হাসো বললে হাসব খুব
কাঁদো বললে কাঁদব,
তোমার দেওয়া সুতো দিয়েই
নিজের হাতটা বাঁধব।

এখন শুধু প্রশ্ন এই—
নিশ্বাস কি নিতে পারি?
নাকি তারও হিসেব দেবে
তোমার সরকারি ডায়েরি?

চুপ করে সব মেনে নেওয়াই
আমাদের এই সভ্যতা,
আসল মানুষ হারিয়ে গিয়ে
বেঁচে থাকুক নীরবতা।
◈ ২৮ ◈
নির্জনতা
হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ পেরিয়ে এলাম,
পেছনে তাকিয়ে দেখি—
কোনো পদচিহ্ন নেই।

বাতাস কি তবে সব ধুয়ে নিয়ে গেল?
নাকি আমি আদপেই হাঁটিনি কোনোদিন?

ভেতরে একটা মস্ত বড় নীল আকাশ,
সেখানে কোনো মেঘ নেই, কোনো পাখিও নেই।
শুধু একটা প্রদীপ জ্বলছে একা—
যার কোনো সলতে নেই, কোনো তেলও নেই।

তুমি ডাকলে?
নাকি ওটা আমারই নিজের গলার প্রতিধ্বনি?

চুপ করো।
এই নিস্তব্ধতার ভেতরেই এখন ঘর বাঁধতে হবে۔
◈ ২৯ ◈
সেলাই
শার্টের কোণটা ছিঁড়ে গেছে আজ হঠাৎ,
তুমি ভাবলে বুঝি এ বড় অপমানের রাত।
অথচ ওই সুতোটুকু দিয়ে জোড়া আছে সব—
আমাদের এই যাপিত দিনের যত কলরব।

দাঁড়াও, একটু বসো না হয় সুই-সুতো নিয়ে,
ছেঁড়া জায়গাটা ঢেকে দাও গভীর মায়া দিয়ে।
পৃথিবী তো রোজই ছিঁড়ে খুঁড়ে যেতে চায়,
আমরা শুধু সেলাই দিয়ে বাঁচি নিরুপায়।

ওই ক্ষুদ্র ফোঁড়টুকুই আমাদের আসল ঘর,
বাকি সব তো কেবলই বাইরের চরাচর।
◈ ৩০ ◈
বইয়ের পাহাড়
খোকার কাঁধে মস্ত ব্যাগ, ভেতরে তার বিশ্ব,
রঙিন ছবি হারিয়ে গিয়ে খোকা এখন নিঃস্ব।
অঙ্ক আছে, তক্কো আছে, ভূগোলেতে টান,
পাখির ডাকের বদলে শোনে যন্ত্র-গানের গান।

মা বলছেন, ‘শিখতে হবে, হতে হবে মস্ত’,
বাবা বলেন, ‘নাম্বার চাই, জগত বড় শক্ত’।
খোকা কেবল জানলা দিয়ে মেঘের আনাগোনা
দেখতে চেয়েও দেখছে শুধু ঘরের চারকোনা।

একটু মাটি, একটু ঘাস, কোথায় গেল তারা?
বইয়ের নিচে চাপা পড়ে শৈশব আজ হারা।
◈ ৩১ ◈
ঠিকানা
ঘর বলতে তো ওই চারটে দেওয়ালই বুঝি আমরা,
যার ভেতরে আলমারি আছে, আর আছে কয়েকটা গোপন দীর্ঘশ্বাস।
তুমি যখন কড়া নাড়লে, আমি ভাবলাম বাতাস—
অথচ দরজা খুলতেই দেখি, দাঁড়িয়ে আছে দিগন্তজোড়া এক আকাশ।

ভিতরে আসো, একটু বসো এই পুরনো চৌকিতে,
এখানে রোদের চেয়ে ছায়ারাই বেশি কথা বলে।
আমরা যারা ঘর আগলে বসে আছি সারাজীবন,
তারা কি জানি—বাইরের ওই ধুলোবালিতেই আসল পরিচয় জ্বলে?

ঠিকানা হারিয়ে ফেলাটাই এখন সবচেয়ে বড় পাওয়া,
যেখানে কোনো নাম নেই, কেবল আছে একলা হওয়া۔
◈ ৩২ ◈
হারিয়ে যাওয়া
বুকের ভেতর মস্ত বড় একটা ছিল মাঠ,
সেথায় চলত সাত সকালে মেঘেদেরই পাঠ।
এখন সেখানে মস্ত বড় ইটের দালান খাড়া,
মনটা আমার দেয় না কেন আগের মতন সাড়া?

পকেট ভরা ছিল আমার নীল কাচেরই গুলি,
এখন শুধু পকেট ভরা মিথ্যে কথার ঝুলি।
রোজ দুপুরে আসত উড়ে রঙিন কোনো পাখি,
এখন কেন দু’চোখ আমার ধুলোয় মাখামাখি?

ইচ্ছে ছিল আকাশটাকে করব শুধু নীল,
এখন কেবল অঙ্ক কষি, মেলাই শুধু মিল।
হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে ডাকি শুধু আজ—
মাথার ওপর চেপে আছে পাহাড় সমান কাজ।
◈ ৩৩ ◈
তুচ্ছ
টেবিলের কোণে পড়ে আছে একটা পুরোনো চাবি,
ওর আর কোনো সংসার নেই, নেই কোনো দাবি।
যেই সিন্দুক ও খুলত, সে আজ মরচে-ধরা কাঠ,
অথচ ওর শরীর জুড়ে এখনো সেই পুরনো পাঠ।

আমরা সবাই আসলে এক একটা হারানো চাবি—
ভুলে গেছি কোন দরজার জন্য আমাদের এই দাবি।
পকেটে নিয়ে ঘুরি এক অকেজো অন্ধকার,
অথচ ভাবি, পৃথিবীটা কেবলই আমার আর তোমার।

একটু ধুলো জমুক না হয় ওই চাবির গায়,
মরার আগে ও অন্তত নিজের নির্জনতা পায়।
◈ ৩৪ ◈
রঙের খেলা
রোদ চনচন, মেঘ পনপন
আকাশ জুড়ে নীল,
ডানায় মেখে রুপোলি রোদ
উড়ছে সাদা চিল।

ঘাসফড়িংয়ের সবুজ জামা
দুলছে হাওয়ার নাচে,
একটু কেবল রঙের ছোঁয়া
বকুলতলার কাছে।

কখন এলে, কখন গেলে
কেউ জানে না তার,
খেলনাগুলো সাজিয়ে রেখে
বন্ধ হবে দ্বার।

একটুখানি হাসির পরে
একটুখানি চুপ—
এই তো জীবন, এই তো ভুবন
মায়ার অপরূপ।
◈ ৩৫ ◈
বিবেকের ছুটি
খুব সকালে উঠে দেখি জানালাটা বন্ধ,
ঘরে দিব্যি সাদা রোদ, কোনো নেই দ্বন্দ।
বাইরে নাকি রক্ত ঝরে? শহর নাকি পুড়ছে?
আমি বলি— দূর মশাই! নীল পতাকা উড়ছে।

পকেটে হাত দিয়ে দেখি বিবেকটা বেশ ঠান্ডা,
জলখাবারে দিব্যি আছে পাউরুটি আর আন্ডা।
ভদ্রলোকেরা এসব নিয়ে খুব একটা ভাবেন না,
আয়না দিয়ে মুখটা ঢেকেছেন, কেউ তো আর পাবেন না।

যাও ঘুমাও, খবরের কাগজটা মুড়িয়ে রাখো নিচে,
আসলে আমরা সবাই দৌড়াচ্ছি ছায়ার পিছে।
মাঝে মাঝে চিৎকার করতে ইচ্ছে তো করেই,
কিন্তু গলার কাছে এসে শব্দগুলো নিজেই মরেই।
◈ ৩৬ ◈
সহজ পাঠ
সবাই বলে সোজা পথে চলো,
মিথ্যে কথা কক্ষনো না বলো।
আমি দেখি মস্ত বড় বীর—
মিথ্যে বলেই উঁচিয়ে আছে শির।

বইয়ের পাতায় লেখা ছিল নদী,
পাহাড় থেকে নামবে নিরবধি।
আমি দেখি শুকনো বালুর চর—
পাহাড় কেটে উঠছে উঁচু ঘর।

মা বলেছে, মানুষ হতে শেখো,
চোখের কোণে একটু মায়া রেখো।
আয়না দেখে ভয় লাগে আজ ভারী—
মানুষ তো নই, কেবলই মুখধারী।

রোজ সকালে মুখস্থ করি ভুল,
বিকেলের ওই গন্ধ হারানো ফুল।
◈ ৩৭ ◈
শহর ও সবুজ
দেওয়াল।
চতুর্দিকে কেবলই দেওয়াল।
রঙ চটে যাওয়া বিজ্ঞাপনের নিচে
দাঁড়িয়ে আছি আমরা।

তুমি কি মেঘ খুঁজছো?
নাকি সেই হারানো খাতা—
যেখানে বৃষ্টির ফোঁটা আঁকতে গিয়ে
পুরো পাতাটা ভিজে যেত?

এখন আকাশ নেই।
এখন শুধু ইলেকট্রিক তারের আল্পনা।
পাখিগুলো কোথায় গেল?
সবাই কি তবে পাথরের ডানা নিয়ে
ঘর পাল্টাল?

ফিরে এসো।
অন্তত নিজের বুকের ভেতর
একটু ঘাস জমিয়ে রাখো।
◈ ৩৮ ◈
কেনাবেচা
বাজারে আজ অনেক ভিড়,
সবাই নিজের জিভটা বিক্রি করতে এসেছে।
দাম দস্তুর চলছে বেশ—
কার জিভ কতখানি মিঠে, কারটা বেশি তিতো।

তুমি হাসছ?
অথচ তোমার পকেটেও তো একটা রসিদ রাখা।
সত্যি বলতে কী,
এই শহরে এখন কেবল বোবারাই সবচেয়ে দামী।

দাঁড়াও, একটু পরে বিজ্ঞাপনের আলো জ্বলবে—
তখন দেখবে, আমাদের রক্তও কেমন চমৎকার নীল হয়ে গেছে।
◈ ৩৯ ◈
মেঘের সিন্দুক
আকাশ কোণে মেঘ জমেছে, মস্ত বড় সিন্দুক,
তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে হাজার হাজার বন্দুক?
না না ওটা বন্দুক নয়, ওটা হলো বৃষ্টি—
সবার চোখে জল মাখিয়ে করবে নতুন সৃষ্টি।

কেমন করে চাবি খোলে? কে দিয়েছে তালা?
বজ্র দাদু ডাকছে জোরে, পড়ছে বিষম জ্বালা।
চড়ুই পাখি ভিজে চপচপ, ঘুলঘুলিতেই লুকোয়—
রোদ উঠলে পালকগুলো নি নি করেই শুকোয়।

আমরা কেন ঘরে বসে? চলো না দিই ঝাঁপ—
বৃষ্টি মেখে ধুয়ে ফেলি যত আছে সব পাপ!
◈ ৪০ ◈
গল্প বলা
সত্যি কথা
বলতে মানা,
মিথ্যে দিয়ে
মেলব ডানা।

সাজিয়ে রাখো
কাচের ঘর,
আপন মানুষ
করবে পর।

রঙের মেলায়
হারিয়ে মুখ,
কিনতে চাইছ
পুতুল-সুখ।

অন্ধকারে
চুপটি করে—
শঙ্খ বাজে
অন্য ঘরে।
◈ ৪১ ◈
ভদ্রলোক
সবাই যখন দিচ্ছে তালি,
আমিও তবে হাতটা নাড়ি।
শহর জুড়ে রক্ত ঝরুক—
আমার কেবল নিজের বাড়ি।

জানলা দিয়ে দেখছি সব,
বলছি মনে "বড্ড বাড়াবাড়ি"।
কিন্তু যখন ডাকলো তারা,
বললাম মোর বড্ড তাড়া—
এখন আমি ব্যস্ত ভারী।

সবাই যখন জিন্দাবাদে
গলা মেলায় উচ্চসুরে,
আমি তখন পর্দা টেনে
পালিয়ে বাঁচি অনেক দূরে।

নিজের ছায়া কামড়ে ধরে
বলছি আমিই মস্ত বীর,
আসলে ভাই চামড়া বাঁচাই—
আমিই আসল 'ভদ্র' ভিড়।
◈ ৪২ ◈
পণ্য
সকালবেলা বাজার গেলেই নিজের মাথা বিকিয়ে দিই,
বিনিময়ে এক থলি ভর্তি মিথ্যে কথা কিনে নিই।
ভারী সুন্দর দেখতে সে সব, চিকচিক করে রোদে—
আমরা সবাই মেতে আছি খুব অদ্ভুত এক 'মোদে।

বিবেকটাকে আলমারিতে চাবি দিয়ে রেখেছি,
দেয়াল জুড়ে কত রকম রঙিন ছবি এঁকেছি।
রক্ত মাখা হাতটা এখন গ্লাভস দিয়ে ঢাকা—
চতুর ছেলে, শিখলে ভালোই উল্টো পথে হাঁকা!

আয়না বলে, "কেমন আছো?"
আমি বলি, "চুপ!
বিক্রি হয়ে যাওয়ার পরেই পাল্টে গেছে রূপ।"
◈ ৪৩ ◈
প্রশ্ন (১)
ছেলেটি আমায় শুধাল হঠাৎ, "বাবা, সত্য কী?"
আমি থমকে দাঁড়ালাম, হাতে তখন বাজারের থলি।
চারিদিকে কত শোরগোল, কত বিজ্ঞাপনের ভিড়,
আমি ভাবলাম, ওকে কী মিথ্যে শান্ত্বনা দিয়ে বলি?

বললাম, "সত্যি হলো ওই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়।"
ও হাসল, বলল, "ও তো মেঘের আড়ালে ঢাকা।"
আমি বললাম, "তবে ওই বয়ে চলা নদীটা দেখো—"
ও বলল, "ওর জলেও তো দেখি অনেক বিষ মাখা।"

আমি ঘরে ফিরলাম মাথা নিচু করে, নিঃশব্দে।
ওর ছোট চোখের আয়নায় দেখলাম নিজেরই মুখ—
যেখানে হাজারটা মিথ্যে জমে আছে পাহাড়ের মতো,
আর রক্তের ভেতর বয়ে যাচ্ছে এক বিষাক্ত অসুখ।

পরদিন ও আর কিছু জানতে চাইল না আমার কাছে,
শুধু বুঝলাম, বড় হওয়ার প্রথম পাঠ ওর হয়ে গেছে।
◈ ৪৪ ◈
ফেরা
সবাইকে তো দিলে অনেক, এবার তবে নিজের কাছে ফেরো,
বুকের ভেতর জমানো ওই নীল আকাশটা এবার তবে ঘেরো।

অনেক কথা বললে তুমি, অনেক দিলে তালি,
এখন দেখো তোমার থালায় উপচে পড়ছে কেবল রুপোলি বালি।

নাগরিক এই জটলা ছেড়ে চলো ওই নদীর বাঁকে,
যেখানে জল নিজের ভাষায় একটি সহজ নামই কেবল ডাকে।

সে নাম তোমার নয় তো কারো, সে নাম কেবল বয়ে যাওয়ার—
কিছুই না নিয়ে নিঃস্ব হাতেই আসল জিনিস খুঁজে পাওয়ার।

দাঁড়াও কিছুক্ষণ, নিজের ছায়াটাকেও এবার মুক্তি দাও—
মাটির সোঁদা গন্ধে মিশে নিরুদ্দেশের নৌকাখানি বাও।
◈ ৪৫ ◈
প্রশ্ন (২)
খোকা এসে জিজ্ঞেস করে, "বাবা, তোমার হাতে ওটা কী?"
আমি বলি, "কিছু না রে, ওটা কেবলই একটা দীর্ঘশ্বাস।"
সে হাসে, বলে, "দীর্ঘশ্বাস কি তবে অতটা লাল হয়?
নাকি ওটা কারোর বুকের থেকে ছিঁড়ে আনা বিশ্বাস?"

আমি জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকার দেখি,
শহরে তখন উৎসবের নামে জ্বলছে মস্ত চিতা।
খোকা আবার টানে জামার হাতা, "চুপ করে আছ কেন?
বলো না, কেন তোমার আঙুলগুলো আজ এতটা তিতা?"

আমি কোনো উত্তর খুঁজে পাই না আর—
কেবল আলমারিতে লুকিয়ে রাখি আমার সব কটা হার।
◈ ৪৬ ◈
নিভৃত
দেওয়াল জুড়ে কেবলই এক ছায়া
তুমি ভাবছো ওটাই মায়া।
হাত বাড়ালেই ঠান্ডা পাথর লাগে,
অন্ধকারটা বুকের ভেতর জাগে।

ঘরের কোণে জমছে কেবল ধুলো,
স্মৃতিগুলো খুব এলোমেলো।
বাইরে যখন মিছিল নামে জোরে,
আমি তখন মরছি নিজের ঘোরে।

বলার ছিল অনেক কথা জানি,
এখন শুধু চোখের কোণে জল আর গ্লানি।
একটু একা থাকতে দাও না আমায়—
সবাই কি আর লড়াই হতে পালায়?

আমি কেবল নিজের সাথে একা,
পাহাড় সমান একলা হওয়া শেখা।
◈ ৪৭ ◈
বিক্রি
রাস্তার মোড়ে ভিড় বেড়েছে খুব,
সবাই এখন নিজের মুখ বেচতে এসেছে।
কেউ দিচ্ছে সস্তায়, কেউ বা চড়া দামে—
বিজ্ঞাপনের নিচে আসল মানুষটা কি আর বেঁচে আছে?

তুমি হাসছ?
ওটা কি তোমার হাসি, নাকি ওটাও কেনা?
তোমার চোখের আয়নায় এখন হাজারটা লোগো,
চিনতে পারছি না—তুমি কি সেই চেনা?

শহরটা এখন মস্ত বড় এক হাট,
হৃদয় থেকে ঘাম—সবই এখানে পণ্য।
এসো, আমরাও লাইন দিই ওই মিছিলে—
নিজেদের হারিয়ে ফেলার উৎসবে আজ সবাই ধন্য।

বাকি রইল শুধু একটুখানি ছায়া—
সেটাকেও কি বিকিয়ে দিলে শেষমেশ, মায়া?
◈ ৪৮ ◈
রোদের ছুটি
রোদ চড়েছে নিমগাছটাতে,
ঝিলিমিলি তার হাসি,
ছুটি পেয়েছে মেঘের দলের
সাদা মেঘের রাশি।

ঘাসফড়িংয়ের ডানায় আজ
রঙ লেগেছে খাসা,
বটগাছটাতে বাঁধছে চড়ুই
নতুন একটা বাসা।

ডাকছে কোকিল কুহু-কুহু,
শুনছে বকুল মাসি—
বই ফেলে আজ পাহাড়তলির
সবুজ ঘাসে বসি।

সবাই যখন ব্যস্ত ভীষণ
কাজ মেলাবার ছলে,
আমি না হয় বসেই রইলাম
একলা নদীর কূলে।
◈ ৪৯ ◈
গাছগাছালি
শহর জুড়ে ইটের পাহাড়
দমবন্ধ এই জীবন যাপন,
কোথায় গেল বকুল তলা?
কোথায় গেল বনের আপন?

গাছগুলো সব দাঁড়িয়ে একা
ঠায় দাঁড়িয়ে পথের ধারে,
কেউ কি তাদের দুঃখ বোঝে?
কেউ কি তাদের ডাকতে পারে?

একটি পাতায় সবুজ হাসি
একটি ডালে পাখির গান,
ওরাই তো ভাই লুকিয়ে রাখে
সবার মরণ-বাঁচন প্রাণ।

এসো তবে হাতটা ধরি
সবুজ দিয়ে স্বপ্ন বুনি,
গাছগাছালির বুকের ভেতর
হৃৎপিণ্ডের শব্দ শুনি।
◈ ৫০ ◈
হিসেব
এত কথা কেন বলো?
তার চেয়ে বরং একবিন্দু নুন হয়ে থিতিয়ে যাও।

সারাটা জীবন ধরে সমুদ্র হতে চেয়েছিলে—
এখন ওই ছোটো আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে
নিজের নোনা জলটুকু অন্তত চিনে নাও।
❖ ❖ ❖
প্রসূন গোস্বামী — শব্দের নির্জনতা
“আমরা কেবল ছায়ার পিছে দৌড়ে যাওয়া এক কবি”
— নিভৃত সংলাপ, ২১

COMMENTS

Name

anglo-bengali,7,bengali-poetry,70,blog-post-formatter,1,explore,9,history,2,know-more,29,poetry-book,2,tag-faqs,2,tag-quizzes,11,tags-common,11,you-tube,1,
ltr
item
PGDRMC | Master Question Tags & Enjoy Bengali Poems: নিভৃত সংলাপ: মুখোশ, বিবেক ও অস্তিত্বের পঞ্চাশটি কবিতা | প্রসূন গোস্বামী
নিভৃত সংলাপ: মুখোশ, বিবেক ও অস্তিত্বের পঞ্চাশটি কবিতা | প্রসূন গোস্বামী
মুখোশের আড়ালে বিবেকের সিঁড়ি বেয়ে নিভৃত সংলাপ – প্রসূন গোস্বামীর কবিতার বইয়ে স্থান পেয়েছে পঞ্চাশটি কবিতা।
PGDRMC | Master Question Tags & Enjoy Bengali Poems
https://www.pgdrmc.eu.org/2026/03/httpspg.unaux.comnibhrata-sanglap-prasun-goswami-kobita.html
https://www.pgdrmc.eu.org/
https://www.pgdrmc.eu.org/
https://www.pgdrmc.eu.org/2026/03/httpspg.unaux.comnibhrata-sanglap-prasun-goswami-kobita.html
true
2250597950626338054
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Read more Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share on social media STEP 2: Click the link on your social media Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy Table of Contents